‘জুলাই যোদ্ধা’ সুরভীর মায়ের করা মামলায় ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ, লুকিয়েছে বয়স

নাইমুর রহমান দুর্জয়

গাজীপুর করেসপন্ডেন্ট

গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় একই দিনে দায়ের হওয়া বিপরীতমুখী দুটি মামলায় অপ্রাপ্তবয়স্ক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও ‘জুলাই যোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী (১৭) গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। সুরভীর মায়ের করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো তাঁকেই গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়—যা আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ নভেম্বর কালিয়াকৈর থানায় দুটি মামলা রেকর্ড হয়। একটি মামলা (নম্বর ৩৮) দায়ের করেন সাংবাদিক নাইমুর রহমান দুর্জয়, যেখানে সুরভীসহ চারজনকে আসামি করা হয়। একই দিনে অপর মামলা (নম্বর ৪০) দায়ের করেন সুরভীর মা মোসা. ছামিতুন আক্তার, যেখানে দুর্জয়কে একমাত্র আসামি করা হয় এবং অভিযোগ আনা হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১০ ধারায়।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—দুটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা একই ব্যক্তি, কালিয়াকৈর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ওমর ফারুক। সুরভীর আইনজীবী ও গাজীপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান কামালের ভাষ্য অনুযায়ী, সুরভীর মায়ের মামলায় তাঁর বয়স ১৭ বছর উল্লেখ থাকলেও দুর্জয়ের মামলায় বয়স দেখানো হয় ২১ বছর। একই দিনে, একই থানায়, একই তদন্ত কর্মকর্তার অধীনে দুটি মামলা থাকা সত্ত্বেও সুরভীর বয়স সংক্রান্ত এই সাংঘর্ষিক তথ্য আমলে না নিয়েই পুলিশ প্রায় এক মাস পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

আইনজীবীর অভিযোগ, অপ্রাপ্তবয়স্ক সুরভীকে গত ২৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে টঙ্গীর নিজ বাসা থেকে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময়ের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। আদালতে হাজির করার সময়ও পুলিশ সুরভীর প্রকৃত বয়স গোপন রেখে রিমান্ড আবেদনে ২১ বছর উল্লেখ করে। পরে গাজীপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২ দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

দিনভর জুলাই যোদ্ধাদের আন্দোলন ও সন্ধ্যায় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদনের শুনানি শেষে রিমান্ড বাতিল করে জামিন মঞ্জুর করা হয়। সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে সুরভী গাজীপুর জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান।

অন্যদিকে, সুরভীর মায়ের দায়ের করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত জুলাই–আগস্টের ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের সুবাদে ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ওই ছাত্রীর সঙ্গে সাংবাদিক নাইমুর রহমান দুর্জয়ের পরিচয় হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, পরিচয়ের পর থেকেই দুর্জয় তাঁকে হোয়াটসঅ্যাপে কুপ্রস্তাব ও ভ্রমণের প্রলোভন দেখাতে থাকেন। ১৮ নভেম্বর সাক্ষাৎকারের কথা বলে তাঁকে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকায় ডেকে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে গাজীপুরের সফিপুর এলাকায় একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান, যেখানে শ্লীলতাহানি ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করা হয়েছে।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ঘটনার পর দুর্জয় ক্ষমা চেয়ে অডিও ক্লিপ মুছে ফেলতে চাপ দেন এবং আত্মহত্যার হুমকিও দেন। মান-সম্মান ও পারিবারিক চাপে থানায় অভিযোগ দিতে কিছুটা বিলম্ব হয় বলে জানিয়েছেন বাদী।

সূত্র বলছে, দুর্জয় আগে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার ছিলেন এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে তোলা ছবি ব্যবহার করে নিজেকে তাঁর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিতেন। অফিসের কোনো অ্যাসাইনমেন্ট ছাড়াই ব্যক্তিগত কারণে গাজীপুরে যাওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় ওই গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষ তাঁকে চাকরিচ্যুত করে। বর্তমানে তিনি ‘কালবেলা’য় কর্মরত বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যাখ্যান, জনসমক্ষে প্রতিবাদ এবং চাকরি হারানোর জেরে দুর্জয় প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে সুরভীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে মামলা করেন এবং কথিত ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ চালান। তবে তাঁর মামলার এজাহারে ৫০ কোটি টাকা চাঁদাবাজির দাবির কোনো সুস্পষ্ট ভিত্তি নেই বলেও আইনজীবীরা দাবি করেছেন।

কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন বলেন, একই দিনে পক্ষে-বিপক্ষে দুটি মামলা হওয়ার বিষয়টি তিনি সম্প্রতি জানতে পেরেছেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও সুরভীকে গ্রেপ্তার এবং অপর মামলায় কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আদালত তদন্ত কর্মকর্তাকে শোকজ করেছেন, তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে জবাব দেওয়ার পর বিষয়টি দেখা হবে।

এ ঘটনায় পুলিশি তদন্তের স্বচ্ছতা, অপ্রাপ্তবয়স্কের অধিকার সুরক্ষা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হলে দুই মামলার নিরপেক্ষ ও সমান্তরাল তদন্ত ছাড়া বিকল্প নেই।

Comments

Popular posts from this blog

আয়কর রিটার্ন ছাড়াই পাওয়া যাবে ১৩ ধরনের অনেক সেবা