গাজীপুরে নিষিদ্ধ পিরামিড স্কিম ও অবৈধ এমএলএম ব্যবসার অবাধ বিস্তার


স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, গাজীপুর

গাজীপুর জেলায় নিষিদ্ধ পিরামিড স্কিম ও অবৈধ মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কার্যক্রম নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অল্প বিনিয়োগে “নিশ্চিত কোটিপতি”, “রেফারেল বোনাসে জীবন বদলে যাবে”, “প্যাসিভ ইনকাম”—এমন আকর্ষণীয় স্লোগানে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে প্রতারক চক্র। আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে নজরদারির দুর্বলতায় এসব চক্র শিল্পাঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আবাসিক এলাকায় সক্রিয় নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।

গাজীপুর জেলায় লাইসেন্সহীন সিকোইয়া, উইথলোকালস, বিটেক, এসবিএফ বা এসবিএফ২৬, নিউলাইফ, অ্যাকসেল ইত্যািদি নামধারী এসব নিষিদ্ধ পিরামিড স্কিম ও অবৈধ এমএলএম কোম্পানি সক্রিয় রয়েছে।


কীভাবে কাজ করে এই পিরামিড স্কিম

পিরামিড স্কিমের কাঠামো এমন যে, নতুন সদস্য যোগ না হলে পুরোনো সদস্যদের অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব হয় না। অর্থাৎ প্রকৃত কোনো পণ্য বা সেবার ভিত্তি না থাকলেও ‘নতুন বিনিয়োগ’ দিয়েই আগেরদের লভ্যাংশ দেওয়া হয়। অর্থনীতির ভাষায় এটি unsustainable recruitment-driven model—যেখানে নগদ প্রবাহ নির্ভর করে কেবল সদস্য বৃদ্ধির ওপর। একপর্যায়ে সদস্য সংগ্রহ থেমে গেলে পুরো কাঠামো ভেঙে পড়ে, আর অধিকাংশ বিনিয়োগকারী মূলধন হারান।

বাংলাদেশে ২০১৩ সালের মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং অ্যাক্টিভিটিস (কন্ট্রোল) অ্যাক্ট অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া এমএলএম পরিচালনা এবং পিরামিড স্কিম নিষিদ্ধ। আইন ভঙ্গ করলে তিন থেকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে; প্রতারণায় দোষী হলে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণও দিতে হতে পারে।

তবুও গাজীপুরে বিভিন্ন নামে সক্রিয় হয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠান—যাদের অনেকেই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম নকল বা কাছাকাছি উচ্চারণ ব্যবহার করে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে।


নকল পরিচয়ে প্রতারণা

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কিছু চক্র বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয়ভাবে শাখা খোলে। যেমন, নেদারল্যান্ডসভিত্তিক পর্যটন প্ল্যাটফর্মের নাম ব্যবহার করে ‘উইথলোকালস’ পরিচয়ে একটি চক্র বিনিয়োগ সংগ্রহ করছিল। এ ঘটনায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জামালপুর থেকে চক্রের মূল হোতাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে।

এ ধরনের নাম-সাদৃশ্য কৌশল নতুন নয়। বিশ্বব্যাপী পিরামিড স্কিম পরিচালনাকারীরা ব্র্যান্ড-ইমিটেশন, ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর, জাল লাইসেন্স ও সাজানো ‘সাফল্যের গল্প’ ব্যবহার করে। গাজীপুরেও একই কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।


শিল্পাঞ্চল টার্গেট: শ্রমিক-শিক্ষার্থী-গৃহিণী

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে কর্মরত হাজারো শ্রমিক ও মধ্যম আয়ের পরিবারকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। প্রতারকরা কারখানার গেটের সামনে, মেস-বাড়ি, কোচিং সেন্টার এবং সামাজিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানে “মোটিভেশনাল সেমিনার” আয়োজন করে।

প্রথমে অল্প টাকার ‘প্যাকেজ’—এরপর আরও সদস্য আনলে বাড়তি কমিশন— এভাবেই গড়ে ওঠে চেইন। আর বিটেক সদস্য অফার করে ৩শ টাকা থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায়। কয়েকজন প্রাথমিক সদস্য কিছু অর্থ ফেরত পেলেও অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত মূলধন হারান।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি wealth transfer mechanism—যেখানে নিচের স্তরের বহু মানুষের অর্থ উপরের কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়।


‘মিস্ট্রাল এআই’ নামের আড়ালে আত্মসাৎ

আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে স্থানীয়ভাবে ‘মিস্ট্রাল এআই’ পরিচয়ে একটি এমএলএম চক্র কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আলোচনায় আসে। ভুক্তভোগীদের একাংশ মামলা করলে দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। একাধিক মামলা এখনো চলমান।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তি-ভিত্তিক বিনিয়োগ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ট্রেডিং, ক্রিপ্টো রিটার্ন—এসব শব্দ ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। অথচ প্রকৃতপক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য ব্যবসা কাঠামো ছিল না।


নাগরিক সমাজের উদ্বেগ

জাতীয় নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, “এটি শুধু আর্থিক অপরাধ নয়; এটি সামাজিক আস্থার ওপর আঘাত।” তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, দুদক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিত তদন্তের আহ্বান জানান।

গাজীপুর নাগরিক কমিটির সভাপতি জুলীয়াস চৌধুরী বলেন, “অবৈধ এমএলএম, পিরামিড স্কিম ও অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে যে বিপুল অর্থ পাচার হয়, তা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এটি মহামারির রূপ নেবে।”


কেন ভয়াবহ?

নিষিদ্ধ পিরামিড স্কিম ও অবৈধ এমএলএম ব্যবসা কেবল অর্থনৈতিক প্রতারণা নয়, এটি বহুমাত্রিক সামাজিক সংকট তৈরি করে। অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে পারিবারিক কলহ, সম্পর্কের অবনতি এবং চরম ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। সঞ্চয় হারালে স্থানীয় বাজারে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে এই অবৈধ লেনদেন অপরাধচক্রকে শক্তিশালী করে তোলে এবং অর্থ পাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এড়িয়ে গেলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং প্রতারণার প্রবণতা আরও বিস্তৃত হয়।


সতর্কতার উপায়

যেকোনো বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নম্বর ও সরকারি অনুমোদন যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। কেউ যদি “নিশ্চিত উচ্চ মুনাফা” বা ঝুঁকিমুক্ত বিপুল লাভের প্রতিশ্রুতি দেয়, সেটিকে সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। কোনো প্রতিষ্ঠানে পণ্য বা সেবার চেয়ে সদস্য সংগ্রহে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলে সেটি পিরামিড স্কিম হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় এবং ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে অভিযোগ জানানো উচিত, যাতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব হয়।


গাজীপুরে অবৈধ পিরামিড স্কিম ও এমএলএম ব্যবসার এই বিস্তার প্রমাণ করে—লোভনীয় প্রতিশ্রুতির আড়ালে সংগঠিত আর্থিক অপরাধ কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আইন প্রয়োগ ও জনসচেতনতা—এই দুইয়ের সমন্বিত প্রয়াসে এই চক্র ভাঙার সময় এসেছে।
 
আগামী পর্বে বিস্তারিত থাকছে। চোখ রাখুন আইডিয়াল ট্রিবিউনের পর্দায় ...

Comments